প্রিন্ট এর তারিখঃ Oct 17, 2026 || প্রকাশের তারিখঃ Jan 7, 2026
সমাজ গঠনে ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব
সমাজ গঠনে ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব
মানবসভ্যতার শুরু থেকেই ধর্ম মানুষের জীবনাচরণ, চিন্তা-চেতনা ও নৈতিক মানদণ্ড গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে ধর্মীয় শিক্ষা অনেকের কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও বাস্তবতা হলো—নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক অস্থিরতা ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
ধর্মীয় শিক্ষা মানুষকে স্রষ্টা, জীবন ও জগত সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। এটি মানুষকে কেবল জ্ঞানী নয়, বরং সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, সহনশীলতা, পরোপকার ও আত্মসংযমের মতো গুণাবলি মানুষের চরিত্রে বিকশিত হয়—যা একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল সমাজ গঠনের মৌলিক ভিত্তি।
বর্তমান সমাজে অপরাধপ্রবণতা, দুর্নীতি, পারিবারিক ভাঙন ও নৈতিক অবক্ষয় আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এর অন্যতম কারণ নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অভাব। ধর্মীয় শিক্ষা মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি ও জবাবদিহির চেতনা সৃষ্টি করে, যা মানুষকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। আইন বাহ্যিকভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে—যা সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
শিক্ষাক্ষেত্রেও ধর্মীয় শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনে সহায়তা করে এবং অর্জিত জ্ঞানকে মানবকল্যাণের পথে পরিচালিত করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মবিমুখ শিক্ষা মানুষকে দক্ষ কর্মী বানালেও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হতে পারে। তাই আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয় একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও নৈতিক জাতি গঠনের জন্য অপরিহার্য।
পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় শিক্ষা অনস্বীকার্য ভূমিকা রাখে। বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা, দুর্বল ও অসহায়ের প্রতি সহানুভূতি এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের শিক্ষা ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকেই উৎসারিত হয়। ধর্মীয় শিক্ষায় গড়ে ওঠা সমাজে সহিংসতা কমে এবং পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়।
কোরআন ও হাদিসে ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আল-আলাক: ১)
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
আরও বলা হয়েছে,
“তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে তারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করে…।” (সূরা আত-তাওবা: ১২২)
এখানে দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ ও তা সমাজে প্রচারের নির্দেশ স্পষ্ট।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ।” (সুনান ইবনু মাজাহ: ২২৪)
এছাড়া তিনি আরও বলেন,
“আল্লাহ যাকে কল্যাণ দিতে চান, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন।” (সহিহ বুখারি: ৭১; সহিহ মুসলিম: ১০৩৭)
কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে স্পষ্ট হয় যে, ধর্মীয় শিক্ষা কেবল ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ব্যক্তিগত চরিত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। একটি নৈতিক, শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাজ বিনির্মাণে ধর্মীয় শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
তাই রাষ্ট্র, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উদ্যোগে ধর্মীয় শিক্ষার যথাযথ চর্চা ও প্রসার নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে সম্মানিত অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান—তারা যেন সন্তানের ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হন।
লেখক : মোঃ ইউসুফ
প্রভাষক, বোরহানউদ্দিন কামিল মাদ্রাসা
লেখক ও ধর্মীয় আলোচক
খতিব, বাইতুল আমান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, তজুমদ্দিন, ভোলা