প্রিয় ভোলাবাসী,
আপনাদের বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট আজ ভাষাহীন। কাউকে বলা যাচ্ছে না, আবার না বলেও থাকা যাচ্ছে না। কারও চোখের কোণে জমে উঠছে অশ্রু, কারও জায়নামাজ ভিজে যাচ্ছে স্ত্রীর–মেয়েদের নীরব কান্নায়। এমন অনুভূতি অস্বাভাবিক নয়—বরং এটাই স্বাভাবিক।
যে মানুষটির জন্য এই জনপদের মানুষের এত মমতা, এত ভালোবাসা, তিনিও আজ এই পরিস্থিতিতে আপনাদের চোখের দিকে তাকাতে পারছেন না! কী দিয়েই বা তিনি বোঝাবেন আপনাদের? আর আপনারাই বা কী দিয়ে তাঁকে বোঝাবেন?
এই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীও চেয়েছিলেন একটি উৎসবমুখর নির্বাচন। কিন্তু এমন একজন মানুষের বিপরীতে নির্বাচন করতে হবে—এমনটা তিনি কল্পনাও করেননি। তাঁর কর্মী–সমর্থকরাও চাননি এমন একটি পরিস্থিতি।
ভোলা–২-এর মানুষ চেয়েছিল নির্বাচন হবে উৎসবের মতো, প্রতিযোগিতা হবে সৌহার্দ্যের। কিন্তু এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—এটি বিএনপির কোনো আন্তরিক কর্মীও মন থেকে কামনা করেননি।
একটি বাস্তব গল্প বলি
আপনাদের প্রিয় হুজুর মাওলানা ফজলুল করিম দু-এক সপ্তাহ থেকেই জানতেন—এই আসনে এলডিপির একজন প্রার্থী মনোনয়ন পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন। জোটগত বাস্তবতায় হয়তো তিনি মনোনয়ন পেয়েছেন, এমনকি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করতেও পারেন।
কিন্তু সত্যটা হলো আপনি যদি নির্বাচন করেন বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখানের মানুষের কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবেন। আপনি সেবা করতে চান—এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এমনভাবে সেবা করতে চাইলে, যা একটি জনপদের মানুষের হৃদয়ে আঘাত করে, সেটি কি সত্যিই সেবা হয়ে ওঠে?
শেষ পর্যন্ত আপনি নির্বাচন করেনও, সেটি হবে নিজের প্রতিই এক ধরনের বেইনসাফি। কারণ যেকোনো উদ্দেশ্যে রাজনীতিতে এলে মানুষ শুধু ভোটার নয়—পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজের কাছেও দায়বদ্ধ থেকে যায়।
এই জনপদের মানুষ জানে—এই আসনে দু’জন মানুষ বছরের পর বছর গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে, শত রাত নির্ঘুম কাটিয়ে মানুষের পাশে থেকেছেন। তাঁদের সংগ্রাম, তাঁদের ঘাম, তাঁদের ভালোবাসা—সবকিছুরই সাক্ষী এই জনপদ।
আর সত্যি বলতে কী, আপনি নিজেও একসময় জানতেন না—আপনি এই জনপদের মানুষের প্রতিনিধি হবেন। হঠাৎ লবিংয়ের মাধ্যমে মনোনয়ন পাওয়াটা রাজনীতির বাস্তবতা হতে পারে, কিন্তু মানুষের অনুভূতির বাস্তবতা ভিন্ন। আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই—মনের ভেতর হাত রেখে উত্তর দেবেন।
এই আসন্ন জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে আপনি কি এই জনপদের একজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসে এক কাপ চা খেয়েছেন? একদিনের জন্যও কি ন্যূনতম কোনো কার্যক্রম চালিয়েছেন?
উত্তর আসবে না—আপনিও জানেন।
তবু কেন লক্ষ মানুষের হৃদয়ে আঘাত?
গত বৃহস্পতিবার জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের ভোলার আসনগুলোর প্রার্থী তালিকা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আমি এই জনপদের একজন পর্যবেক্ষক—অনেকে আমাকে চেনেন, অনেকে চেনেন না।
এই তালিকা প্রকাশের পর আমি এমন মানুষের কান্না দেখেছি—যাঁদের রাজনীতি ফজলুল করিমের রাজনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।
মধ্যরাতে হুজুরের ঘনিষ্ঠ একজনকে ফোন দিয়ে সেই ভিন্ন মতাদর্শের মানুষটি “মুখে কথা নেই”একটি পর্যায়ে তিনি কেঁদেই ফেললেন”। শুধু এক দুজন নারী-পুরুষ নয়, এর সংখ্যা অগনিত।
ভোলা–২-এর জোটপ্রার্থী—এই লেখা আপনার চোখে পড়ুক বা না পড়ুক, আপনার কোনো শুভানুধ্যায়ী নিশ্চয়ই আপনাকে ভোলার ভেতরের এই গল্পগুলো শোনাবেন।
হয়তো আপনি হাসবেন, বলবেন—রাজনীতিই হলো কে কাকে ডিঙিয়ে চেয়ারে বসতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন, রাজনীতি মানুষের জন্য। অনেক সময় রাজনীতিবিদদের জনগণের জন্য নিজের জীবন, নিজের স্বপ্ন, নিজের সুযোগও কোরবানি দিতে হয়।
ভোলা–২-এর মানুষের স্বপ্ন ছিল কিছুটা ভিন্ন। আপনি এই জনপদে জন্মেছেন—এই ইতিহাস আপনার অজানা নয়। নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে কটূক্তির প্রতিবাদে বোরহানউদ্দিনে এক সমাবেশে চারজন ইসলামপ্রেমিক শহীদ হন। এই শহীদের জনপদ—এটিকে মূল্যায়ন করা কি আমাদের সবার দায়িত্ব নয়?
মাওলানা ফজলুল করিমকে ঘিরে মানুষের আবেগের কারণ গভীর। চার যুগেরও বেশি সময় তিনি মাঠে–ময়দানে ইনসাফের কথা বলে গেছেন। দুই যুগের বেশি সময় ভোলা জেলা জামায়াতের আমির ছিলেন। এই জনপদের এমন কোনো মাঠ নেই, যেখানে তাঁর কণ্ঠে কোরআনের বাণী পৌঁছেনি। ইসলাম ও ন্যায়ের কথা তিনি মানুষের কানে কানে পৌঁছে দিয়েছেন। ভোলা–২-এর মানুষ তাই চেয়েছিল—যাঁর কণ্ঠে তারা যুগের পর যুগ পথ খুঁজে পেয়েছে, সেই কণ্ঠ সংসদেও শুনতে।
সর্বশেষ আমি একজন ভোলা–২-এর নাগরিক হিসেবে বিএনপির কর্মী–সমর্থকদের বলতে চাই—আপনাদের এমপি প্রার্থী এই আসনেরই একজন পরীক্ষিত মুখ। তিনি আগেও সংসদে গিয়ে তার প্রমাণ রেখেছেন। জামায়াতের প্রার্থী ফজলুল করিমও আপনাদের হাফিজ ইব্রাহিমের ২০০১ সালের নির্বাচনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন।
আজ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোট দেওয়ার সুযোগ এসেছে। সাবেক দুই মিত্র—বিএনপি ও জামায়াত—দু’জন নেতা নির্বাচন করতে চাইছেন। দু’জনই এই জনপদের মানুষের সেবা করতে চান।
তাই অনুরোধ—শুধু দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার কারণে হুজুরকে কোনো প্ল্যাটফর্মে এমন ভাষায় আক্রমণ করবেন না, যাতে ভোলার মানুষ কষ্ট পায়। হতে পারে দলীয় কৌশলে তিনি শেষ পর্যন্ত এখানে নির্বাচন করবেন না।
তারপরও উভয় পক্ষের ভাষায় শালীনতা থাকা জরুরি। সমালোচনা হবে—কিন্তু তা হবে মার্জিত, মানবিক ও দায়িত্বশীল। ভোলা-২ জনগণের শাসক চাই, এই কামনা।
_লেখক: আবু আব্দুল্লাহ ওয়াফি_