নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
আজ ১৩ ডিসেম্বর—জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলার ইতিহাসে এক অনন্য গৌরবের দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে পাকহানাদার বাহিনীকে বিতাড়িত করে মুক্তিকামী জনতা ও মুক্তিযোদ্ধারা আক্কেলপুর থানাকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা করেন। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতি বছর বিজয় দিবসের তিন দিন আগে দিনটি ‘আক্কেলপুর হানাদারমুক্ত দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল সান্তাহার থেকে রেলপথে পাকসেনারা আক্কেলপুরে প্রবেশ করে। পথে জাফরপুর স্টেশনের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকা ও ভদ্রকালী গ্রামে অগ্নিসংযোগ চালিয়ে তারা তাণ্ডব শুরু করে। একের পর এক বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়, চালানো হয় নির্বিচার গুলি। এ সময় আব্দুল মজিদ নামে এক মুক্তিকামী গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন।
ওই দিন বিকেলে পাকবাহিনী আক্কেলপুর শহরে প্রবেশ করে সিনিয়র মাদ্রাসায় প্রধান ক্যাম্প স্থাপন করে। পাশাপাশি আক্কেলপুর রেলস্টেশন, নবাবগঞ্জঘাট (পারঘাটি) কেন্দ্রীয় দুর্গা মন্দির, জামালগঞ্জ ও তিলকপুর রেলস্টেশনে শাখা ক্যাম্প গড়ে তোলে। রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও দালালদের সহায়তায় তারা বিভিন্ন গ্রামে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নারী নির্যাতনে লিপ্ত হয়।
ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে আক্কেলপুরের সাধারণ মানুষ জীবন বাঁচাতে বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেয়। একই সময়ে বহু তরুণ গ্রাম ছেড়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন দেশকে স্বাধীন করার দৃঢ় শপথে। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে আক্কেলপুরের অঘোষিত থানার অন্তত আটজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
বগুড়ার পাইকার বংশের সন্তান খোকন পাইকার—যাঁর নামে বর্তমানে বগুড়ায় শহীদ খোকন পার্ক প্রতিষ্ঠিত—ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরার পথে আক্কেলপুর উপজেলার রোয়াইর গ্রামে দালালদের হাতে ধরা পড়েন। পরে তাঁকে পাকসেনাদের হাতে তুলে দিলে সিনিয়র মাদ্রাসা ক্যাম্পের পেছনে গুলি করে হত্যা করা হয়। পাহাড়পুরের যুদ্ধে আক্কেলপুরের ফজলুল করিমসহ আরও অনেকে শহীদ হন। এসব শহীদের গণকবর আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত আক্রমণ, জনগণের সর্বাত্মক সহায়তা ও সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ভোরে পাকসেনারা পায়ে হেঁটে জয়পুরহাটের দিকে পালিয়ে যায়। একই সঙ্গে রাজাকার ও দালালরাও আত্মগোপনে চলে যায়। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিবাহিনী আক্কেলপুরের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
দুর্গাদত্ত আগরওয়ালার গদি ঘরে প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে আক্কেলপুরকে স্বাধীন ঘোষণা করা হয়। উড়তে থাকে স্বাধীন বাংলার লাল-সবুজ পতাকা।
স্মৃতিচারণ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. হাফিজার রহমান বলেন,
“১৩ ডিসেম্বর সকালে মিঠাপুর থেকে সদলবলে গুলি ছুড়তে ছুড়তে আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে আমরা আক্কেলপুরে প্রবেশ করি।”
উপজেলা বীর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক মো. নজরুল ইসলাম বলেন,
“ভোরেই হানাদার বাহিনী আক্কেলপুর ছেড়ে পালিয়ে যায়। এরপর শত শত মুক্তিযোদ্ধা আক্কেলপুরে প্রবেশ করে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করেন।”
১৩ ডিসেম্বর তাই আক্কেলপুরবাসীর কাছে শুধু একটি দিন নয়—এটি ত্যাগ, বীরত্ব ও স্বাধীনতার এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস।